গর্ভকালীন সমস্যা ও স্ত্রী রোগ

সার্ভিক্যাল ক্যান্সার বা জরায়ুমুখ ক্যান্সার কী?

২০১৮ সালের International Agency for Research on Cancer (IARC)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১২ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় সাড়ে ছয় হাজার নারী মারা যান সার্ভিক্যাল ক্যান্সার বা জরায়ুমুখ ক্যান্সারে। প্রতিবছরই এত মৃত্যু হওয়া সত্ত্বেও জরায়ুমুখ ক্যান্সার নিয়ে আমাদের অনেকেরই খুব একটা ধারণা নেই। অথচ একটু সচেতন থাকলে খুব সহজেই জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সার্ভিক্স হলো জরায়ুর নিচের দিকের অংশ, যা নারী দেহের যোনি এবং জরায়ুকে সংযুক্ত করে। যখন এই জায়গার কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তন হতে শুরু করে তখন ব্যাপারটি ক্যান্সারে রূপ নেয়। অনেক সময় ক্যান্সার সার্ভিক্স থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে ফুসফুস, যকৃত, মূত্রথলি, যোনি, পায়ুপথেও ছড়িয়ে যেতে থাকে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার হয় এক ধরনের ভাইরাসের আক্রমণে, যার নাম “হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস”। আর এটি ছড়ায় ওই ভাইরাস আছে এমন কারো সাথে যৌনমিলন হলে। যৌনমিলনের সময় পুরুষের কাছ থেকে নারীদেহে এই ভাইরাস ঢুকে যায়। ভাইরাসটি ঢোকার সাথে সাথেই ক্যান্সার হয় না, ক্যান্সার হতে বেশ কয়েক বছরও লাগতে পারে। যখন নারীর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় তখনই এই ভাইরাসটি ক্যান্সার রোগের সৃষ্টি করে।


জরায়ু মুখের ক্যান্সারের মূল অসুবিধাটি হলো এটি শেষ পর্যায়ে গেলেই শুধুমাত্র ব্যথা দেখা দেয়। এর আগপর্যন্ত এর লক্ষণগুলোকে অনেকেই মাসিকের মেয়েলি সমস্যা বলে মনে করেন। ক্যান্সার যখন একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে যায়, তখন রোগটা অনেক দূর ছড়িয়ে যায়।

প্রাথমিকভাবে কোনো ব্যথা থাকে না দেখেই আমাদের দেশের নারীরা হাসপাতালে আসেন না। এমনকি যখন হয়, হওয়ার পরেও তারা অপেক্ষা করে। দেখা যায় দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যাচ্ছে কিন্তু লজ্জায় সে কাউকে বলছে না। স্বামীর সাথে মেলামেশায় রক্ত যাচ্ছে সেটিও সে বলছে না। ফলে যখন হাসপাতালে আসে তখন অনেকে দেরি হয়ে যায়।

অথচ এতদূর পর্যন্ত এটি গড়ানোরই কথা নয়। কারণ অন্য ধরনের ক্যান্সারের তুলনায় জরায়ুমুখের ক্যান্সার সবচাইতে সহজে নির্ণয় করা যায়।

এমনকি হওয়ার আগেই খুব সহজ একটি পরীক্ষায় ধরা যায় ক্যান্সার হওয়ার আগের অবস্থা আছে কি না। এই পরীক্ষাকে বলে ভায়া টেস্ট। যৌন সম্পর্কে আছেন, এমন নারীরা ভায়া টেস্ট করিয়ে নিলেই জানতে পারবেন, তার জরায়ুমুখ ক্যান্সার হওয়ার আগের অবস্থায় অছে কি না।

এছাড়া নিয়মিত ভায়া টেস্ট করালে ক্যান্সার হবার আগেই তা নির্ণয় করা সম্ভব–এমনকি যদি কারো জরায়ুমুখ ক্যান্সার হয়–প্রাথমিক অবস্থায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা করলে তা ভালো হয়ে যায়।

জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়ের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপ, অর্থাৎ ভায়া টেস্ট করানোটা অত্যন্ত সহজ। কোনো ব্যথা লাগে না।  সময়ও লাগে মাত্র এক মিনিট। যেসব নারীর বয়স ৩০ থেকে ৬০-এর মধ্যে তাদের প্রতি ৫ বছর পরপর ভায়া টেস্ট করানো দরকার।

৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সি নারীরা সবচেয়ে বেশি সার্ভিইক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

যারা ঝুঁকিতে আছেন:

  • ১৬ বছর বয়স হওয়ার আগেই যৌনসংগমের অভিজ্ঞতা থাকলে কিংবা পিরিয়ড শুরুর ১ বছরের মধ্যেই যৌন সঙ্গম শুরু করে থাকলে।
  • স্বামী বা যৌন সঙ্গীর শরীরে ভাইরাসটি থাকলে।
  • অনেকজন যৌনসঙ্গী থেকে থাকলে।
  • জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘদিন, বিশেষত ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বড়ি সেবন করে থাকলে।
  • ধূমপানের অভ্যাস আছে যাদের।
  • শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি থাকলে।
  • যৌনসংগমের মাধ্যমে ছড়ায় এমন কোনো রোগ থেকে থাকলে। যেমন–এইডস, সিফিলিস, গনোরিয়া, ইত্যাদি।

লক্ষণসমূহ:

  • যৌনসংগমের সময় ব্যথার অনুভূতি।
  • অস্বাভাবিকভাবে যোনিদেশ থেকে রক্তপাত হলে। যেমন–যৌনসংগম পরবর্তী সময়ে, দুটি পিরিয়ডের মধ্যবর্তী সময়ে,পিরিয়ড বা রজঃশ্রাব বন্ধ হবার পরে, শ্রোণিদেশের কোনো পরীক্ষার পরে।
  • যোনিদেশ থেকে অস্বাভাবিকভাবে কোনো পদার্থ বের হতে থাকলে।

ক্যান্সার ছড়িয়ে যেতে থাকলে যে সমস্ত লক্ষণ দেখা যায়–

  • শ্রোণিদেশে ব্যথা।
  • প্রস্রাবে সমস্যা।
  • পা ফুলে যেতে থাকা।
  • কিডনি ফেইলিউর।
  • হাড়ে ব্যথা হওয়া।
  • ওজন কমতে থাকা এবং ক্ষুধামান্দ্য।
  • দুর্বলতা অনুভব করা।

কখন একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

রজঃনিবৃতির পরেও রক্তপাত হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এমনটি ঘটলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত

রক্তপাত হলে কিংবা দুটি পিরিয়ডের মাঝে প্রায়ই রক্তপাত হলে আপনার চিকিৎসককে জানান।

বাংলাদেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, এমনকি নির্বাচিত কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে, এনজিও ক্লিনিকগুলোতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা বোঝার  এই ভায়া টেস্ট বিনামূল্যে করা হয়।

তাই অবহেলা বা সংকোচ না করে নিজের ও আপনার পরিবারের প্রতি ৫ বছর পরপর নিয়মিত জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রাথমিক পরীক্ষা অর্থাৎ ভায়া টেস্ট করুন। জরায়ুমুখ ক্যান্সার থেকে নিরাপদ থাকুন।

এছাড়া জরায়ুমুখ ক্যান্সারই একমাত্র ক্যান্সার যার টিকা আছে। মাসিক শুরুর পরপরই এবং যৌন সম্পর্ক শুরু কিংবা বিয়ের আগে টিকা নিলে এই ক্যান্সার থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।

https://www.webmd.com/cancer/cervical-cancer/cervical-cancer

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

সম্পর্কিত পোস্ট

আরও আরও...আর পাওয়া যায়নি.