খাদ্য-পুষ্টি ও জীবনযাত্রা

হ্যাবিট লুপ বা অভ্যাসের চক্র কী?

মানুষ অভ্যাসের দাস–এটা প্রবাদেই আছে। আমাদের দৈনন্দিন কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো করতে আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে সেগুলো করতে আমাদের চিন্তাই করতে হয় না। নিয়মিত করা ভালো অভ্যাস বহুদিন থাকে এবং খারাপ অভ্যাস ছাড়তেও বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই যে যে-কোনো কাজ নিয়মিত করতে করতে সেটা অভ্যাসে পরিণত হওয়া–এটাকেই বলে হ্যাবিট লুপ বা অভ্যাসের চক্র।


হ্যাবিট লুপ: 

চার্লস ডুহিগ তার “দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিট” বইতে কীভাবে একটা অভ্যাস তৈরি হয় তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এখানে তিনি অভ্যাসের চক্র বা হ্যাবিট লুপের তিনটি উপাদানের কথা বলেন। উপাদানগুলো হলো:

১. সংকেত: 

সংকেত বলতে বোঝায় সেই জিনিসটি যা অভ্যাসটি শুরু করার সংকেত দেয়। এটা কোনো নির্দিষ্ট সময়, স্থান, অন্য কোনো কাজ, মনের অবস্থা ইত্যাদি যে-কোনো কিছু হতে পারে। যেমন, উদ্বিগ্ন অবস্থায় দাঁত দিয়ে নখ কাটা, ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে খাবারের পর সিগারেট খাওয়া ইত্যাদি। এখানে সিগারেট খাওয়াটা হচ্ছে অভ্যাস যার সংকেত হলো খাবার খাওয়া।

২. রুটিন:

চিন্তা না করেই বা মনের অজান্তে অভ্যাসটি সম্পন্ন করা সম্ভব। এই অংশটিকে রুটিন বলে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন, ৫টা বাজতেই কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়া। এমনও হতে পারে যে, অভ্যাস হয়ে ওঠার আগে কাজটি করার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগত। যেমন ক্লান্ত লাগলে চা খাওয়া, অবসরে ফোন চালানো ইত্যাদি। 

৩. পুরস্কার:

অভ্যাস থেকে পাওয়া ভালো অনুভূতি অথবা সুফলকেই পুরস্কার বলা হচ্ছে এখানে। এই পুরস্কারটির কারণেই একটি অভ্যাস স্থায়ী হয়। সকালে ব্রাশ করার পুরস্কার হলো পরিষ্কার ও সতেজ নিশ্বাস।

পুরস্কারের কারণে খারাপ কাজও অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। অবসরে সোশ্যাল মিডিয়া দেখতে দেখতে হয়তো কেউ সারাদিন বা রাত কাটিয়ে দিতে পারে। তবে ভালো বা খারাপ যাই হোক, পুরস্কারের চাহিদা তৈরি হলেই কাজটি নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে স্থায়ী হয়।

অভ্যাস কীভাবে তৈরি ও পরিবর্তন হয়

কোনো অভ্যাস তৈরি করতে বা ছাড়তে সেটির হ্যাবিট লুপ বা অভ্যাসের চক্র গড়তে বা ভাঙতে হবে। এই অভ্যাসের চক্রটি ভাঙতে হলে নিচের ধাপগুলো মেনে চলতে হবে:

১. রুটিনটি চিহ্নিত করুন:

যে অভ্যাসটি বদলাতে চান এবং তার রুটিনটি চিহ্নিত করুন। ধরুন, আপনি দেরিতে ঘুম ভাঙার অভ্যাস ছাড়তে চান। সেটি করতে হলে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া কিংবা অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে যাওয়ার রুটিনটি পরিবর্তন করতে হবে। 

২. অন্য পুরস্কার বের করুন:

হ্যাবিট লুপের পুরস্কার অংশটির জন্য খারাপ অভ্যাসগুলো স্থায়ী হয়। খারাপ অভ্যাসটি কেন আপনি বারবার করছেন তা খুঁজে বের করুন। ধরুন, আপনি ফোনে আসক্তির অভ্যাসটি পরিবর্তন করতে চান। এখন, বিনোদন, প্রিয়জনের বার্তা কিংবা সময় কাটানো–এগুলো সব শুধু সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই পেলে ফোনে আসক্তি বাড়বেই, তাই না? তাই ফোনের বদলে ১০ মিনিট বই পড়ুন, চা/কফি তৈরি করে সময় কাটান। বিনোদনের উৎস হিসেবে ফোনের পরিবর্তে অন্য কিছু যখন হবে তখন ফোনে আসক্তি এমনিতেই কমে যাবে। 

৩. সংকেত চিহ্নিত করুন:

কোন সংকেতগুলো আপনার অভ্যাসটি শুরুর ইঙ্গিত দেয় তার উদাহরণ প্রথমেই দেওয়া হয়েছিল। যেই অভ্যাসটি বদলাতে চান, খেয়াল করুন আপনি কোথায়, কখন, কাদের উপস্থিতিতে, কেমন মনের অবস্থায় বা কোন কাজের পরে সেটি করছেন। কয়েকদিন ধরে চিহ্নিত করার চেষ্টা করুন আপনার জন্য প্রযোজ্য সংকেতটি কী। অভ্যাস ছাড়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এটি।

৪. পর্যবেক্ষণগুলো প্রয়োগ করুন:

ধরুন, অ্যালার্ম বাজলে সেটি বন্ধ করে অতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাস আপনার। এটি করছিলেন কারণ সকালের কাজগুলো করতে আগ্রহী না আপনি। কিন্তু অভ্যাসটি পর্যবেক্ষণ করে বুঝবেন যে, দেরিতে উঠে হুলস্থুল করে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতেও দেরি হচ্ছে। পর্যবেক্ষণের সাথে সাথে আসে প্রয়োগের ব্যাপারটা। যখন আপনি আপনার বাজে অভ্যাসের কারণ এবং এর ফলে ক্ষতি সম্পর্কে জানেন তখন আপনার জন্য কী করে সেই অভ্যাসটি বদলানো যায় সেটি বের করা এবং সেটি প্রয়োগ করা সোজা। যেমন দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসটি বদলাতে রাতে নাস্তা তৈরি, পোশাক নির্বাচন, প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখা, তারাতারি ঘুমাতে যাওয়া–এই জাতীয় কাজগুলো করতে হবে। এর ফলাফল স্বরূপ আপনি সকাল সকাল  ঘুম থেকে উঠতে পারবেন এবং সকালের কাজগুলো ভালোমতো করতে পারবেন।

মনে রাখবেন একই পন্থা সবার প্রযোজ্য নাও হতে পারে এবং যে-কোনো অভ্যাস স্থায়ী হতে এক মাসেরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। তাই ধৈর্যশীল হতে হবে এবং নতুন রুটিনটি আপনার জন্য ঠিক কি না তা আপনাকেই বিচার করতে হবে।

Source: https://www.healthline.com/health/mental-health/habit-loop

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

সম্পর্কিত পোস্ট

আরও আরও...আর পাওয়া যায়নি.